২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, রবিবার

সালমান বেঁচে থাকলে অনেক নায়কেরই ক্যারিয়ার দাঁড়াতো না : শিল্পী

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

নব্বই দশকের জনপ্রিয় নায়িকা শিল্পী। ১৯৯৫ সালে আমিন খানের বিপরীতে ‘বাংলার কমান্ডো’ ছবি দিয়ে তার অভিষেক ঘটে। প্রথম আলোচনায় আসেন নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত ‘বাবা কেন চাকর’ ছবি দিয়ে। পাঁচ বছরের ক্যারিয়ারে কাজ করেছেন ৩৫টির মতো ছবিতে। আমিন খান, বাপ্পারাজ, মান্না, রিয়াজ, রুবেলসহ বেশ কজন জনপ্রিয় নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন।

অমর নায়ক সালমান শাহের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছিলেন মাত্র একটি ছবিতে। ‘প্রিয়জন’ নামের সেই ছবিটি শিল্পীর ক্যারিয়ারে অনন্য এক পালক যোগ করেছে। সালমানের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটা ছিল বেশ মধুর।

সেই সম্পর্কের সমুদ্রে বহুদিন পর স্মৃতির জাহাজ ভাসালেন নায়িকা। আজ ৬ সেপ্টেম্বর সালমানের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানালেন অনেক অজানা কথা। লিখেছেন লিমন আহমেদ-

প্রতিবেদক: সালমান শাহের সঙ্গে আপনি একটিমাত্র ছবিতে অভিনয় করেছেন। রানা নাসের পরিচালিত ‘প্রিয়জন’। ছবিটি নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

শিল্পী : অভিজ্ঞতা তখনো ভালো, এখনো ভালো। আমি বলবো অভিজ্ঞতা চলমান। এটা সৌভাগ্য যে সালমানের সঙ্গে একটি ছবি করতে পেরেছি আমি। সাধারণত আমরা যারা নব্বই দশকে কাজ করেছি তাদের নিয়ে দর্শকের অন্যরকম একটা ভালো লাগা বা আবেদন কাজ করে। প্রায়ই ছেলেমেয়ের স্কুলে, রাস্তায়, শপিংমলে ভক্তদের কাছ থেকে উপভোগ্য মুহূর্ত পাই। নিজেকে আড়াল করে চলি। তবুও অনেকে বুঝে ফেলেন। দৌড়ে আসেন। বলেন যে আপনি ‘বাবা কেন চাকর’ ছবির নায়িকা না? বা অমুক নায়িকা না? কেউ কেউ বলেন- আপনি তো আমাদের সময়ের নায়িকা। অনেক নারীও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, ছবি তোলেন।

তবে বলতে দ্বিধা নেই, আমি সবচেয়ে বেশি শুনেছি এই কথাটি যে- আপনি সালমান শাহের নায়িকা না? ‘এ জীবনে যারে চেয়েছি’ গানের কথা বলে। এটা সত্যি দারুণ ব্যাপার যে মাত্র একটি ছবি করেছি যে নায়কের সঙ্গে তার নায়িকা হিসেবেই মানুষ আমাকে বেশি চেনে বা জানে। অনেকে সালমানের নায়িকা জানার পর সালমানের ভক্ত হিসেবে অনেক পাগলামির কথা বলেন। একবার ডাক্তার দেখাতে গেলাম এক চেম্বারে, তিনিও সালমানের নায়িকা হিসেবে আমাকে নোটিশ করলেন। আসলে সালমান নব্বই দশকের টিনেজারদের প্রিয় নায়ক ছিল। আইকন ছিল ও। আজকে অনেক এসপি-ডিসি-ডাক্তার বা বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে প্রতিষ্ঠিতরা সালমানভক্ত ছিলেন। সালমান সবশ্রেণির মানুষের কাছে নিজেকে জনপ্রিয় করে তুলতে পেরেছিল। এটাই ওর সবচেয়ে বড় ম্যাজিক বা সাফল্য।

এই যে আজ আপনি আমার সঙ্গে এত আগে থেকে যোগাযোগ করে শিডিউল মিলিয়ে দেখা করতে এলেন এটাও তো সালমানের সঙ্গে ওই সিনেমাটি করার অভিজ্ঞতাই দিচ্ছে। সিনেমা ছেড়ে দিয়েছি ১৯ বছর হয়। আমার সাক্ষাৎকারের কোনো দরকার পড়ে না। তবুও আপনি এলেন সালমানের নায়িকা এই মূল্যায়ন করে। সালমান সম্পর্কে দুটো কথা শুনবার ও জানবার আগ্রহ থেকে।

প্রতিবেদক: প্রিয়জন ছবিতে সালমানের সঙ্গে শুটিংয়ের অভিজ্ঞতাটা জানতে চাই…..

শিল্পী : খুব ভালো। অনেক মজা করতো সালমান সেটে। মেকাপ রুমে এসে পর্যন্ত জ্বালাতো। হয়তো আমি চোখে কাজল দিচ্ছি ও পেছন থেকে এসে বলতো, ‘ইশ, কেন যে কাজল হলাম না।’ হয়তো ঠোঁটে লিপস্টিক দিচ্ছি। ও দেখতে পেরেছে বা জানতে পেরেছে। পেছনে দাঁড়িয়ে সিনেমার সংলাপ দেয়ার স্টাইলে বলতো, ‘হায়রে, নায়িকার লিপস্টিক হতে পারলাম না!’ তার মুখে এসব শুনে শুনে আমি লজ্জায় লাল হতাম।

কিন্তু সালমান ‘ভালগার’ ছিল আমার মনে হয় এই কথাটা কেউ বলতে পারবে না। ও দুষ্টামি-মজাগুলো করতো সবাইকে মাতিয়ে রাখার জন্য। শুটিং করছি হঠাৎ বলে বসলো চলো সবাই পুরান ঢাকায় যাই। খাবো। প্রযোজক তো শুনে অজ্ঞান হয় হয়। শুটিং রেখে নায়ক-নায়িকারা চলে যাওয়া মানে বিপদ। ফেরে কি না ফেরে কোনো ঠিক আছে নাকি! তো প্রযোজক এসে সালমানকে থামাতে বলছে, ‘কষ্ট করে যাওয়ার দরকার নেই। কী খাবেন আমি আনিয়ে দিচ্ছি।’ সালমান হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকতো। আমি হাসতাম আড়ালে বসে। এগুলো সে ইচ্ছে করে করতো।

মনে পড়ে ‘প্রিয়জন’ ছবির শুটিং করতে কক্সবাজার গিয়েছি। সেখানে অনেক মজা করেছি। সালমান তার স্ত্রীকে প্রায়সময়ই আউটডোরে শুটিং হলে নিয়ে যেতো। সেবারও কক্সবাজারে নিয়ে গিয়েছিল। ওরা উঠেছিল প্রবাল হোটেলে। আমি, রিয়াজসহ অন্যরা ছিলাম শৈবালে। প্রচুর আড্ডা মেরেছি আমরা।

প্রতিদিনই সকালে কল টাইম থাকতো। আউটডোরে গেলে একটু সকাল সকাল কাজ করতে হয়। তো একদিন কোনো শুটিং নেই। ভাবলাম আরাম করে ঘুমাবো। সালমান সেদিন ভোর ৬টার দিকে এসে চিৎকার চেচামেচি করে সবাইকে জাগিয়ে তুলে দিয়ে চলে গেল। এই হলো সালমান।

কক্সবাজারে আমরা অনেক মজা করেছি। রিয়াজ তখন ভালো ড্রাইভ জানতো না। আইল্যান্ডের উপর চড়িয়ে দিতো। সে নিয়ে সালমান ওকে ক্ষেপাতো। রিয়াজের সঙ্গে ও খুব মিশেছিল। দেশের বাইরেও আমাদের অনেক মজার অভিজ্ঞতা আছে। হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে। কখনো ভালো লাগে। কখনো মন খারাপ হয়।

প্রতিবেদক: প্রিয়জন ছবিটি ১৯৯৬ সালের জুন মাসে মুক্তি পেয়েছিল। এর দুই মাস পরই সালমান মারা যান। তার সঙ্গে কি ছবিটি দেখা হয়েছিল?

শিল্পী : না। সেই সুযোগ হয়নি। তখন সালমানও অনেক ব্যস্ত, আমিও শুটিং নিয়ে ব্যস্ত। তবে আলাদা আলাদা করে দুজনেই হলে গিয়ে ছবিটি দেখেছিলাম নিজেদের শিডিউল বের করে।

প্রতিবেদক: সালমানের সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা ও পরিচয় কোথায় কীভাবে?

শিল্পী : সেটা নির্দিষ্ট করে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। খুব সম্ভবত কোনো শুটিং সেটেই।

প্রতিবেদক: নায়ক সালমানের সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন ছিল আপনার?

শিল্পী : আমরা সমবয়সী ছিলাম। কিন্তু সিনেমায় সালমান আমার চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র। এই ভাবটা কোনোদিন ওর মধ্যে ছিল না। ও সবসময় আগে রেসপন্স করতো। নিজের চোখে অনেক কিছু দেখেছি এই ইন্ডাস্ট্রিতে। অনেক নায়কের অনেক রকম দাপট ছিল। আজ কিছুই নেই। এমন নায়কও ছিল দশজন বডিগার্ড সঙ্গে নিয়ে এফডিসিতে বা শুটিং স্পটে আসতো।

তবে সালমান ছিল অন্য রকম একটা ছেলে। একেবারেই অন্যরকম। ওকে দেখলেই মনে হতো চিন্তা চেতনায় ও স্টাইল রুচিতে একটু এগিয়ে। ওর স্ত্রীর অবশ্য একটা ভূমিকা ছিল। এটা হয়তো অনেকে জানে না। আমরা যারা কাজ করেছি তারা দেখেছি। সালমানের পোশাক, মেকাপ ঠিক করে দিতো সামিরা। আরেকটা কথা বলি। শাবনূর যখন প্রথমদিকে আসলো তখন দেখবেন অতটা গ্ল্যামারাস ছিল না। সাদা রঙের ভারী মেকাপ করতো। যখন সালমানের সঙ্গে ছবি করতে শুরু করলো শাবনূরের বাহ্যিক পরিবর্তনটা চোখে লাগলো সবার। ওর মেকাপ, চুলের স্টাইল একেক ছবিতে একেক রকম করে দিতো সামিরাই। গানে সালমান-শাবনূরের ম্যাচ করে পোশাক পরা এগুলো সামিরার ডিজাইন ছিল।

সালমানের মৃত্যুর পর আমরা রিয়াজ-শাকিলকে সেসব ফ্যাশন-স্টাইলে দেখেছি। কিন্তু সালমানের মতো ছিল না। এ সময়ে শাকিব অনেক স্টাইলিশ। অনেক ব্রান্ডের পোশাক পরে, ভালো গেটাপ দেখা যায়। কিন্তু সালমানেরটা একেবারেই ভিন্ন। সালমান যদি মারা না যেত অনেক নায়কেরই ক্যারিয়ার দাঁড়াতো না। এটা কিন্তু সত্যি। আর সালমানের যে দূরদর্শী
ভাবনাশক্তি ছিল এতদিনে ও বলিউডের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই মিশে যেত বলে মনে হয় আমার।

এটা অন্য প্রসঙ্গ। এখন থাক। সালমান আমাকে ম্যাডাম বলে ডাকতো। আমি তো তখন সবে ঢুকেছি ইন্ডাস্ট্রিতে। সেটা ১৯৯৫ সালের শেষ দিকে। মোহাম্মদ হোসেনের পরিচালনায় আমিন খানের সঙ্গে ‘বাংলার কমান্ডো’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে মাত্র। নাম ছড়াচ্ছে। সবাই আমার গ্ল্যামারের প্রশংসা করছে। একের পর এক ছবি আসছে। কত নায়ক ছিল দেখেও না দেখার ভান করতো। কিন্তু সালমান এমন ছিল না।

সালমানের সঙ্গে আমার দেখা হতো এফডিসিতে ঢোকার সময়। আমি ঢুকতাম তো সালমান গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে। নয়তো সে ঢুকছে আমি বের হচ্ছি। প্রত্যেকবার সালমান গাড়ি থামিয়ে ডাকতো, ‘ম্যাডাম কেমন আছেন? কবে একটা ছবি করবেন আমার সাথে বলুন’! আমি মজা পেতাম, লজ্জাও পেতাম। তখন সালমান সুপারহিট। ওর মতো নায়ক এভাবে কেন বলতো? একটা নতুন মেয়েকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য, সাহস দেয়ার জন্য।

‘প্রিয়জন’ ছবির আরেক নায়ক রিয়াজও সেটা ভালো উপলব্দি করতে পারবে। কারণ ও তখন নতুন। অনেক কিছুই জানতো না বুঝতো না। সালমান তাকে সেগুলো ভাইয়ের মতো বন্ধুর মতো করে শিখিয়েছে, সাহায্য করেছে। আমিও করেছি আমার জায়গা থেকে।

প্রতিবেদক: আপনার চোখে কে সেরা? নায়ক সালমান শাহ নাকি মানুষ সালমান শাহ?

শিল্পী : মানুষ সালমান শাহ। কারণ ভালো মানুষ না হলে কেউ সফল হতে পারে না। আপনার পরিচয় যাই হোক না কেন, আপনি ভালো মানুষ হলে লোকে আপনাকে সফল বলবে, মনে রাখবে। সালমান শাহকে মানুষ মনে রেখেছে। এটা প্রকৃতির একটা গিফট বলতে পারেন। ভালো মানুষদের প্রকৃতি সবার সামনে আইকন হিসেবে সাজিয়ে রাখে।

মানুষ হিসেবে অসাধারণ ছিল বলেই নায়ক সালমান এত অল্প সময়ে দেশের সবশ্রেণির মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। মৃত্যুর পরও সে জায়গা অটুট। অনেক নায়কই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। বলিউডেও অনেক নামকরা নায়কদের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু সালমান নিয়ে যে উন্মাদনাটা তার মৃত্যুর ২৩ বছর পরও সেটা কিন্তু বিরল ঘটনা।

প্রতিবেদক: অনেকেই বলে থাকেন মৃত্যুর পর সালমান শাহের নাম বেশি ছড়িয়েছে। বা তারকাখ্যাতি এসেছে। আপনিও কি তা মনে করেন?

শিল্পী : আমার তা মনে হয় না। সালমান বেঁচে থাকতেই তো সুপারহিট সব ছবির নায়ক। অল্প বয়সে তার মৃত্যু হয়তো তার আবেদন বাড়িয়েছে। কিন্তু এটা বলা যাবে না যে মরে গিয়ে তারকা হয়েছে সালমান। এগুলো খুবই বাজে কথা। ওর পরে আজ অব্দি ওর মতো কেউ আসেনি তো এখনো।

প্রতিবেদক: সালমান শাহের তিনটি গুণ ও তিনটি দোষ?

শিল্পী : এটা বলা মুশকিল। সালমানের অনেক গুণ ছিল। প্রথমেই বলবো ওর বিনয়। খুব বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতো সালমান। তারপর বলবো মানুষকে সাহায্য করার প্রবণতা ওর মধ্যে প্রবল ছিল। গরিব যে কেউ বিপদে পরে সালমানের কাছে গেলে সালমান তাকে অর্থ সাহায্য দিয়েছে। এগুলো তো নিজে দেখিনি। শুনেছি। কার কাছে শুনেছি, যারা টাকা পেয়েছে তাদের কাছ থেকেই।

সালমান মারা যাবার পর এফডিসিতে গেলেই অনেক কথা শোনা যেত। নাচের মেয়েরা কাঁদতো তার জন্য। বলতো সালমানের মতো করে আর কেউ যখন তখন মানিব্যাগ করে দুহাত ভরে টাকা দেবে না। ওর মৃত্যুর পর অনেক কিছুই শুনেছি যেটা উপলব্দি করিয়েছে ও দানশীল ছিল। ও অল্প কয়টা ছবি করে কত টাকাই বা কামিয়েছিল।

সর্বশেষ শুনেছি সাত লাখ টাকা নিতো সিনেমায়। সাত লাখ টাকা তো আর ঘরে নিয়ে যেতে পারতো না। সিনেমার টাকা সব ঘরে আসে না। এটা প্রবাদ আছে ইন্ডাস্ট্রিতে। তার উপর সালমান ছিল খুব সৌখিন। গাড়ি কিনতো, ড্রেস কিনতো। ও কখনো প্রোডাকশনের ওই জোড়া তালি দেয়া চকচকা রঙের ড্রেসের জন্য বসে থাকতো না। নিজেই নিজেরটা যোগার করতো। ব্রান্ডের দামি দামি সব পোশাক। কিন্তু এতকিছুর পরও দান করতো। তৃতীয় গুণটা, সালমান স্টাইলিশ ও ফ্যাশন সচেতন।

ওর দোষগুলো বলতে ইচ্ছে করে না। মন খারাপ হয়। দোষগুলোর জন্যই ওকে অকালে হারিয়েছি এমনটা মনে হয়। ও প্রচন্ড ইমোশনাল ছিল। নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো না। দ্বিতীয়ত ওর বন্ধুদের সার্কেলটা ভালো ছিল না। সঙ্গদোষের শিকার সালমান। ভালো বন্ধুরা একটা মানুষকে ভালো পথে রাখে, সাহস দেয়, হতাশা কাটায়। কিন্তু সেই সঙ্গটা সালমান পায়নি। বরং অনেকের কাছে শুনেছি শেষদিকে প্রচুর ড্রিংকস করতো সে।

অবশ্য আমি কখনো সালমানকে মাতাল দেখিনি। ওইসব শুনতাম। গাড়িতেও নাকি ড্রিংকস থাকতো। আর স্মোক তো করতোই। সঙ্গদোষটা কাটাতে পারলে হয়তো সালমান সব হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারতো। সবার জীবনেই ফ্রাস্টেশান থাকে। সেটা ওভারকাম করতে হয়। সেটা সালমান পারেনি। এই দুর্বলতাটা ওর তৃতীয় ত্রুটি হতে পারে।

সবার জীবনে ফ্রাস্টেশন থাকে। সালমানেরও হয়তো ছিল। ফ্যামিলি নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু ঝামেলা চলছিল। ক্যারিয়ারের ঝামেলা অবশ্য মিটেছিল। আমার মনে হয় ফ্যামিলি ও ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে ও সাপোর্টটা ঠিকভাবে পায়নি। তবে সেসব বলে তো এখন আর লাভ নেই। ও ফিরবে না। আসলে বড় কথাটা হলো পৃথিবীতে ওর হায়াত শেষ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ তো কত বড় বড় কষ্ট-অভাব নিয়েও বেঁচে থাকছে।

প্রতিবেদক: সালমানের স্ত্রী বা মায়ের সঙ্গে কি পরিচয় ছিল?

শিল্পী : ওই অর্থে ঠিক কোনো ঘনিষ্টতা গড়ে ওঠেনি। তবে চিনতাম তাদের। সামিরার সঙ্গে দেখা বেশি হয়েছে। কারণ সালমানের সঙ্গে প্রায়ই থাকতো।

প্রতিবেদক: শাবনূরের সঙ্গে সালমানের প্রেম নিয়ে অনেক মুখরোচক গল্প শোনা যায়। তাদের সম্পর্ক নিয়ে আপনি কিছু বলবেন? চাইলে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে পারেন-

শিল্পী : এড়িয়ে যাবার কিছু নেই। একজন নায়ক যখন কারও সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করেন তখন তার সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠেই। সেটা কে কীভাবে মেইনটেইন করে তা বলা মুশকিল। সালমান ও শাবনূর একসঙ্গে অনেক ছবিতে কাজ করেছে। তাদের মধ্যে অবশ্যই একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেটা যে প্রেম তা তো হুট করে বলে দেয়া যায় না। রাজ্জাক-কবরী, আলমগীর-শাবানা, উত্তম-সুচিতা জুটি নিয়েও অনেক মুখরোচক গল্প এসেছে। আমিও বাপ্পা ভাই, রুবেল ভাইদের ঘনিষ্ট ছিলাম। অনেক কথাই ছড়াতো। সালমানকে নিয়েও তখন অনেক কথা শুনেছি।

শাবনূরকে নিয়ে সামিরার সঙ্গে সালমানের ঝামেলা হচ্ছে এ রকম খবরও পড়েছি। কিন্তু সেসবের কোনো প্রমাণ ছিল না। তবে সামিরার সঙ্গে শেষদিকে হয়তো সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিলো না সালমানের। তাদের কক্সবাজারে একসঙ্গে দেখেছি কিন্তু উড়ো উড়ো একটা ভাব ছিল। বউ সঙ্গে আছে কিন্তু সেটা নিয়ে খুব একটা আন্তরিক আগ্রহ থাকে না, সেটা দেখিনি। কোথায় যেন একটা ডিস্টার্বনেস কাজ করতো।

প্রতিবেদক: সালমান শাহের মৃত্যুর খবরটি প্রথম কোথায় কার কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন?

শিল্পী : সেদিন তো শুক্রবার ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেছি কেবল। বারান্দায় গেলাম। হঠাৎ শুনলাম সালমান শাহ মারা গেছে। আমি ভাবলাম মজা করছে কী না। পরে দেখলাম যে না লোকগুলো বেশ সিরিয়াস। সাথে সাথে খোঁজ নিলাম। জানলাম, সত্যি সালমান আর নেই! বাকরুদ্ধ হয়ে ছিলাম। ওর সঙ্গে আরও অনেক কাজের কথা ছিল।

প্রতিবেদক: একজন নায়ক ত্রিশ বছরের আগেই মারা গেলেন। ২৩ বছর পার হয়ে গেল। এখনো তার জন্য কাঁদে ভক্তরা। কেক কেটে, মিলাদ দিয়ে তার জন্ম-মৃত্যুদিন পালন করে হাজার হাজার ভক্ত। এখনো কোনো হলে সালমানের সিনেমা প্রদর্শিত হলে দর্শকের ভিড় নামে। সালমান শাহ নিয়ে এই যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের এই ভালোবাসা এটাকে কীভাবে দেখেন আপনি?

শিল্পী : এটাই তো শিল্পীর স্বার্থকতা। সালমান সফল। ওর অভিনয়ের গুণেই ও এই ভালোবাসা পাচ্ছে। ও যে স্ক্রিনে আসতো দর্শক মনে করতো ওর প্রেমটা তাদেরই প্রেম। ওর রোমান্টিকতা, কান্নাকে নিজের মনে করতো। ওকে খুব সহজেই আপন করে নিতে পেরেছিলো। কারণ সালমানের মধ্যে ন্যাচারাল ব্যাপারটা ছিল।

প্রতিবেদক: অনেকদিন ধরেই সালমানভক্তরা প্রিয় নায়কের নামে এফডিসিতে শুটিং ফ্লোর বা স্মৃতি ধরে রাখার মতো কিছু দাবি করে আসছেন। এ বিষয়ে আপনি কিছু বলবেন?

শিল্পী : আমি তো মনে করি অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। সালমানর শাহের মতো করে আর কে এমন আবেদন তৈরি করতে পেরেছে। মাত্র চারটা বছরের ক্যারিয়ার। ২৭টি ছবি। মারা গেছে সেই ২৩ বছর হলো। এখনো সালমান সালমান করে পাগল মানুষ। অদ্ভূত এক জনপ্রিয়তা!

তবে সালমান ভক্তদের আমি বলবো এতে মন খারাপের কিছু নেই। সালমান চিরদিন বেঁচে থাকবে সবার অন্তরে, আমাদের প্রিয়জন হয়ে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন